সত্যই সমজ্ঞান! বেদবাণী ২.১৬২
(১৬২)
"তুল্যনিন্দাস্তুতিৰ্ম্মনি সন্তুষ্টো যেন কেনচিৎ।
অনিকেতঃ স্থিরমতির্ভক্তিমান মে প্রিয়ো নরঃ।।"
সত্যই সমজ্ঞান। (যথাকাশ মহান)
❗*ব্যাখ্যা*
## ১. প্রথম অংশ: সত্যের স্বরূপ ও প্রারব্ধ ভোগ
> **“প্রারব্ধংভুঞ্জমানানি সত্যধ্যান পরায়ণা।" সত্যই স্থির, ধীর, গম্ভীর। অস্থায়ী, অসত্য, প্রবাহ, অনিত্য, থাকে না।**
* **প্রারব্ধ ও সত্যধ্যান:** আমাদের জীবনের বর্তমান পরিস্থিতি বা আমরা যা কিছু ভোগ করছি, তা হলো আমাদের পূর্বকৃত কর্মের ফল বা 'প্রারব্ধ'। গুরুদেব বলছেন, এই প্রারব্ধকে হাসিমুখে ভোগ করার পাশাপাশি মানুষের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত 'সত্যধ্যান পরায়ণ' হওয়া, অর্থাৎ পরম সত্য বা ঈশ্বরের চিন্তায় মগ্ন থাকা।
* **সত্যের চিরন্তন রূপ:** জগতে যা কিছু 'সত্য', তা সর্বদা **স্থির, ধীর ও গম্ভীর**। সত্যের কোনো পরিবর্তন নেই, তা চিরকাল একই থাকে।
* **অসত্যের বিনাশ:** এর বিপরীতে যা কিছু অসত্য, ক্ষণস্থায়ী বা বস্তুগত সুখ-দুঃখের 'প্রবাহ'—তা আসলে **অনিত্য**। সময়ের সাথে সাথে তা ভেসে যায়, চিরস্থায়ী হয়ে টিকে থাকে না। তাই ক্ষণস্থায়ী জগতের মোহে না ভুগে চিরন্তন সত্যকে আঁকড়ে ধরাই মানুষের প্রধান কর্তব্য।
## ২. দ্বিতীয় অংশ: ভাগ্য ও ভোগের সম্পর্ক
> **ভাগ্যং ফলতি সর্ব্বত্র। ভাগ্য হইতেই ভোগ উৎপন্ন হয়, সত্য হইতেই ভোগদান হয়।**
* **ভাগ্যের ফল:** শাস্ত্রে বলা হয়, মানুষের ভাগ্য বা কর্মফল সর্বত্রই ফলায়িত হয়। আমরা জীবনে যে সুখ, দুঃখ বা সুযোগ-সুবিধা পাই, তা আমাদের প্রারব্ধ বা ভাগ্য থেকেই উৎপন্ন হয়।
* **সত্য ও ভোগদান:** কিন্তু এই ভোগকে সার্থক এবং কল্যাণকর করে তোলে একমাত্র 'সত্য'। যখন আমাদের জীবন সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে, তখনই সেই ভাগ্যলব্ধ ভোগ ঈশ্বরের দান বা প্রসাদে পরিণত হয়, যা মানুষকে প্রকৃত শান্তি দেয়।
## ৩. তৃতীয় অংশ: গীতার শ্লোক ও পরম ভক্তের লক্ষণ
> **"তুল্যনিন্দাস্তুতিৰ্ম্মনি সন্তুষ্টো যেন কেনচিৎ। অনিকেতঃ স্থিরমতির্ভক্তিমান মে প্রিয়ো নরঃ।।"**
এটি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বাদশ অধ্যায়ের (ভক্তিযোগ) ১৯ নম্বর শ্লোক। এখানে পরমেশ্বরের প্রিয় ভক্তের লক্ষণ বর্ণনা করা হয়েছে:
* **তুল্যনিন্দাস্তুতিঃ (নিন্দা ও স্তুতিতে যিনি সমজ্ঞানী):** কেউ সমালোচনা বা নিন্দা করলে যিনি ভেঙে পড়েন না, আবার কেউ প্রশংসা বা স্তুতি করলে যিনি অহংকারী হন না—উভয় পরিস্থিতিতেই যিনি মনের ভারসাম্য বজায় রাখেন।
* **মৌনী ও সন্তুষ্ট:** যিনি সংযতবাক (মৌনী) এবং জীবনে যা কিছু পান (যেন কেনচিৎ), তাতেই পরম সন্তুষ্ট থাকেন।
* **অনিকেতঃ (আসক্তিহীন):** 'নিকেত' মানে ঘর বা বাড়ি। 'অনিকেত' বলতে বোঝায় যাঁর জাগতিক কোনো বস্তুর প্রতি মোহ বা আসক্তি নেই। তিনি সংসারে বাস করলেও সংসারের মায়ায় নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন না।
* **স্থিরমতিঃ ও ভক্তিমান:** যাঁর বুদ্ধি ও মন সর্বদা ঈশ্বরে স্থির এবং যিনি গভীর ভক্তিযুক্ত—শ্রীভগবান বলছেন, সেই মানুষই আমার পরম প্রিয় (মে প্রিয়ো নরঃ)।
## ৪. চতুর্থ অংশ: সমজ্ঞান ও মহত্ত্ব
> **সত্যই সমজ্ঞান। (যথাকাশ মহান)**
* **সমজ্ঞান কী?:** যখন মানুষ সবকিছুর মধ্যে সেই এক পরম সত্য বা ঈশ্বরকে দর্শন করতে পারে, তখন তার মধ্যে 'সমজ্ঞান' বা সমদর্শী ভাব জাগ্রত হয়। তখন শত্রু-মিত্র, ভালো-মন্দ, ধনী-দরিদ্রের ভেদ মুছে যায়।
* **আকাশের মতো মহান:** আকাশ যেমন অসীম, বিস্তীর্ণ এবং তার বুকে ভালো-মন্দ সবকিছুকে (মেঘ, ঝড়, রোদ) স্থান দিয়েও নিজে নির্লিপ্ত ও পবিত্র থাকে; ঠিক তেমনি সত্যের পথে চলা সমজ্ঞানী মানুষের মনও আকাশের মতোই মহান ও উদার হয়ে ওঠে।
🌸 সারসংক্ষেপ:
শ্রীশ্রী গুরুদেবের এই অমূল্য বাণীর মূল কথা হলো—জগতে যা কিছু অনিত্য ও পরিবর্তনশীল, তা নিয়ে ব্যাকুল না হয়ে আমাদের মনকে সত্যে স্থির রাখা উচিত। নিন্দা-প্রশংসা এবং ভাগ্যের চড়াই-উতরাইকে সমভাবে গ্রহণ করে, আকাশের মতো উদার মন নিয়ে ভক্তিপথে এগিয়ে চলাই জীবনের প্রকৃত সার্থকতা।

