আপনার ভাগ্যে যা আছে, তা-ই পাবেন! বেদবাণী ২/১০০
বেদবাণী : ২/১০০
আপনি সর্ব্বদা সর্ব্বতোভাবে সহিষ্ণুতার বরণ করিয়া ভাগ্যফল, যে উর্দ্ধ অধঃগতি স্বরূপ অস্থায়ী, অনিত্য, অভাব, এই সকল ত্যাগ করিয়া অর্থাৎ এদের অধীন না থাকিয়া কেবল সত্যনারায়ণের শরণ লইতে চেষ্টা করুন অর্থাৎ অভ্যাস করুন, তিনিই আপনাকে সর্ব্বদা শান্তিতে রাখিবেন। দক্ষযজ্ঞ কখন পূর্ণ হয় না, সত্যের অধীনওথাকিতে পারে না। চিরকাল তো কর্তৃত্ব করিয়া আসিতেছেন, কোন্ কার্য্য সম্পূর্ণ করিতে পারিয়াছেন? বিচার করিয়া দেখুন আপনার ভাগ্যে যাহা আছে তাহাই পাইয়াছেন, তার অতিরিক্ত কিছুই পান নাই। যদি পাইতেন তবে কেন ছেলের বিবাহের জন্য এত ব্যস্ত হইতেছেন। যেখানে ভবিতব্য, অর্থাৎ যার সঙ্গে যার নির্দেশ আছে, সেখানে তার সঙ্গে তার মিলন হইবে। ইহার ব্যতিক্রম করা কোন দেবতার, কি দানব, কি মানবের নাই জানিবেন।
সত্যনারায়ণকে কর্তৃত্বটুকু দিয়া তার সহায় হইয়া থাকিতে পারিলেই সকল ঋণ শোধ করিতে পারিবেন শান্তিও পাইবেন।
উপরোক্ত বেদবাণীর অমূল্য অংশটির সরল ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হলো:
**মূল ভাব ও ব্যাখ্যা**
এই পংক্তিটির মাধ্যমে গুরুদেব মানুষের জীবনের চরম সত্য, ভাগ্য এবং মানসিক শান্তি লাভের উপায় অত্যন্ত সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন। এর মূল কথাগুলোকে কয়েকটি ভাগে আলোচনা করা যেতে পারে:
**১. সহিষ্ণুতা এবং সত্যনারায়ণের শরণাগতি**
গুরুদেব বলছেন যে, আমাদের জীবনে সুখ-দুঃখ, ভালো সময় বা খারাপ সময় (উত্থান-পতন) আসবেই। এই সব কিছুই হলো অস্থায়ী এবং অনিত্য। তাই জীবনের অভাব বা খারাপ পরিস্থিতিতে ভেঙে না পড়ে সর্বদা **সহিষ্ণুতা** (ধৈর্য) ধারণ করতে হবে। পরিস্থিতির দাস বা অধীন না হয়ে, একমাত্র পরমেশ্বর শ্রীসত্যনারায়ণের চরণে নিজেকে সঁপে দেওয়ার অভ্যাস করতে হবে। তিনিই মানুষকে জীবনের সব পরিস্থিতিতে প্রকৃত শান্তি দিতে পারেন。
**২. অহংকার ও 'কর্তৃত্ব' ত্যাগের নির্দেশ (দক্ষযজ্ঞের উদাহরণ)**
আমরা মনে করি আমরাই সব করছি, আমাদের ইচ্ছাতেই সব হচ্ছে—এই অহংকারকে গুরুদেব **'দক্ষযজ্ঞের'** সাথে তুলনা করেছেন। দক্ষরাজা যেমন অহংকারবশত ঈশ্বরকে বাদ দিয়ে যজ্ঞ করতে গিয়ে তা পূর্ণ করতে পারেননি, ঠিক তেমনি মানুষের অহংকার বা 'আমি করছি' এই ভাব কখনো পূর্ণতা পায় না এবং তা চিরন্তন সত্যের অধীন হতে পারে না। মানুষ আজীবন নিজেকে সব কাজের 'কর্তা' ভেবে এসেছে, কিন্তু গভীরভাবে বিচার করলে দেখা যাবে, মানুষ নিজের ইচ্ছায় কোনো কাজই সম্পূর্ণভাবে শেষ করতে পারে না।
**৩. ভাগ্য ও ভবিতব্যের অমোঘ নিয়ম**
গুরুদেব একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, মানুষের ভাগ্যে যতটুকু লেখা আছে, সে ঠিক ততটুকুই পায়, তার বেশি এক বিন্দুও পায় না। যেমন— সন্তানের বিবাহের জন্য মানুষ ব্যাকুল বা ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু সৃষ্টির নিয়মে যার সাথে যার মিলন বা বিয়ে নির্ধারিত (ভবিতব্য) হয়ে আছে, ঠিক সময়ে তার সাথেই তার মিলন ঘটবে। এই বিধির বিধানকে পরিবর্তন করার ক্ষমতা কোনো দেবতা, দানব বা মানুষের নেই। তাই বৃথা চিন্তা বা অধৈর্য হওয়া নিরর্থক।
**৪. ঋণমুক্তি ও পরম শান্তি লাভের উপায়**
জীবনের সমস্ত দায়িত্ব ও কর্মের মূল চাবিকাঠি বা **'কর্তৃত্বটুকু'** নিজের হাতে না রেখে তা সত্যনারায়ণের চরণে সমর্পণ করতে হবে। আমরা যেন কেবল তাঁর ইচ্ছার 'সহায়' বা নিমিত্ত মাত্র হয়ে থাকি। এই শরণাগতির মাধ্যমেই মানুষ এই সংসারের সমস্ত ঋণ (কর্মফল) থেকে মুক্ত হতে পারবে এবং জীবনে পরম শান্তি লাভ করবে。
**সংক্ষেপে:** নিজের অহংকার ত্যাগ করে, ভাগ্য বা পরিস্থিতির ওপর অতিরিক্ত উৎকণ্ঠা না দেখিয়ে, ঈশ্বরের ওপর পূর্ণ ভরসা রেখে ধৈর্য সহকারে কর্তব্য করে যাওয়াই হলো প্রকৃত শান্তি পাওয়ার একমাত্র পথ।

