আসল সত্যযুগ-ধর্ম কী? 🔑 বেদবাণী ৩/১৫৯

 



এ জগতে যাহা কিছু দেখা যায়, চন্দ্র সূর্য্য নক্ষত্রাদি এবং অব্যক্তরূপ অগ্নি প্রভৃতি দেব দানব, যজ্ঞ, রাক্ষস, মানব উপাধিগ্রস্ত কলি, কৃষ্ণ, বিষ্ণু, বৈষ্ণবগণ, শাক্ত শৈবাদি ভিন্ন ভিন্ন উপাসক, ভক্তি মুক্তি প্রভৃতি যাহা লোকের অনুভূতি হয়, সকলি এই স্থির আকাশ মধ্যে অবস্থিতি করিতেছে। এই সকলই সত্ত্ব, রজঃ তমোগুণের চাঞ্চল্য শক্তি হইতে প্রকাশিত হইয়া থাকে। সুখ দুঃখ, ভাব অভাব, শান্তি অশান্তি, ভাল মন্দাদি দ্বন্দু বিকার মাত্র। ইহাই দেবাসুর বলিয়া দুই কুলজাত মানব সম্প্রদায় হইয়া থাকে। ইহাদের জানিত বিদ্যা অভ্যাস করিতে করিতে ঐ শক্তি দ্বারা ভ্রমাত্মক, অনিত্য 'রাক্ষসী' 'আসুরী' রসে ভুলিয়া বন্ধন হইয়া থাকে। দ্বন্দুমুক্ত হইয়া পারে না। অতএব "সাম্প্রদায়িক" দ্বন্দুগত না হইয়া সর্ব্বদা শান্তি অশান্তি তাড়নায় না থাকিয়া সর্ব্বদা, সর্ব্বতোভাবে সর্ব্ব রকমে অসহ্য তাড়না বেগ সহ্য করিয়া থাকাই পরম পবিত্র সত্যযুগ-ধৰ্ম্ম, উপস্থিত স্থায়ী ভাবে বিমুগ্ধ থাকে। গুণের প্রলোভনে সীমাবদ্ধ ব্যতীত অন্য কোন উপলব্ধি থাকে না। পতিব্রত ধৰ্ম্ম মায়ামৃগে আসক্তি জন্মিলে হানি হইয়া যায়। সত্যনারায়ণ পদ লাভ হইতে পারে না। বুজরুকি করিয়া ভ্রমশক্তিকেই মোহিত করিতে পারে। তাহাতে উদ্ধার হইতে পারে না। পতিসেবায় বাধকই শুভ অশুভকৰ্ম্ম। যাহা হউক যতই স্বপ্নে কি জাগ্রতে যাহা কিছু লাভহয় সকলি অভাব, জানিবেন


### **মূল বাণীটির সরল ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা 


এই অমর বাণীতে শ্রীশ্রী ঠাকুরের আধ্যাত্মিক দর্শনের এক পরম সত্য উন্মোচিত হয়েছে। বিষয়টিকে সহজে বোঝার জন্য নিচে পয়েন্ট আকারে ব্যাখ্যা করা হলো:


* **১. সব কিছুর আধার এই স্থির আকাশ:** এ জগতে আমরা যা কিছু দেখতে বা অনুভব করতে পারি—তা হোক চন্দ্র-সূর্য-নক্ষত্র, অব্যক্ত অগ্নি, দেব-দানব, যজ্ঞ, কিংবা বিভিন্ন নামে ডাকা ঈশ্বর বা উপাসক দল (যেমন কৃষ্ণ, বিষ্ণু, বৈষ্ণব, শাক্ত, শৈব) এবং ভক্তি ও মুক্তি—এই সমস্ত কিছুই আসলে এক পরম স্থির আকাশের (পরমব্রহ্মের) মধ্যে অবস্থিত।

* **২. ত্রিগুণের খেলা ও দ্বান্দ্বিক বিকার:** জগতের ভালো-মন্দ, সুখ-দুঃখ, ভাব-অভাব, শান্তি-অশান্তি—এগুলো সব সত্ত্ব, রজঃ ও তমোগুণের চঞ্চলতার কারণে তৈরি হওয়া মনের বিকার বা ভ্রম মাত্র। এই দ্বান্দ্বিক বিকারের ওপর ভিত্তি করেই মানব সম্প্রদায় 'দেব' ও 'অসুর'—এই দুই কুলে বিভক্ত হয়ে যায়।

* **৩. আসুরী রসে বন্ধন:** মানুষ যখন এই জাগতিক বিদ্যা ও শক্তির অভ্যাস করতে করতে এর গভীরে হারিয়ে যায়, তখন সে এক অনিত্য, ক্ষণস্থায়ী 'রাক্ষসী' বা 'আসুরী' মোহের বশে আটকে পড়ে। এর ফলে সে সংসারের এই দ্বন্দ্ব (সুখ-দুঃখের চক্র) থেকে কখনো মুক্ত হতে পারে না। গুণ ও মোহের প্রলোভনে পড়ে তার আত্মিক উপলব্ধি সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।

* **৪. পরম পবিত্র সত্যযুগ-ধর্ম কী?:** ঠাকুর বলছেন, কোনো প্রকার "সাম্প্রদায়িক" দ্বন্দ্বে জড়ানো যাবে না। শান্তি বা অশান্তির তাড়নায় অস্থির না হয়ে, জীবনের সমস্ত অসহ্য কঠিন পরিস্থিতি ও মানসিক বেগকে মুখ বুজে সহ্য করে নেওয়াই হলো এই সময়ের সবচেয়ে বড় এবং পবিত্র **'সত্যযুগ-ধর্ম'**।

* **৫. পতিব্রতা ধর্ম ও সত্যনারায়ণ লাভ:** যেমন একজন পতিব্রতা নারী অন্য কোনো মোহে আকর্ষিত হন না, তেমনি সাধকের মন যদি জাগতিক রূপ-রস বা 'মায়ামৃগের' (মায়ার হরিণ) প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে, তবে তার পারমার্থিক ক্ষতি হয়ে যায়। বাহ্যিক 'বুজরুকি' বা অলৌকিক ক্ষমতা দেখিয়ে হয়তো কিছু সময়ের জন্য মানুষকে মোহিত করা যায়, কিন্তু তাতে আত্মার উদ্ধার বা 'সত্যনারায়ণ পদ' লাভ সম্ভব নয়।

* **৬. সব লাভই আসলে অভাব:** স্বপ্নে বা জাগরণে আমরা জাগতিক ও অলৌকিক যা কিছু লাভ করি না কেন, তা আসলে অন্তিমে 'অভাব' বা শূন্যতা মাত্র। একমাত্র শুভ ও অশুভ কর্মের ঊর্ধ্বে উঠে নিষ্কামভাবে ঈশ্বরের সেবা করাই মুক্তির পথ।


---

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ