জাগতিক সমস্ত অসার ও অনিত্য পদার্থকে চিনে নিয়ে, মনকে শুদ্ধভক্তির দিকে চালিত করতে হবে। বেদবাণী ১/ ২৩৯

 

,


বেদ বাণী ১/২৩৯ 

সংসারের আবল্য চিরকালই কালচক্রের সাহায্যে বিচরণ করিতেছে। তদ্দ্বারায় ভাল মন্দ, সুখ দুঃখ, শান্তি অশান্তি, আপন পর, শত্রু মিত্রাদি দ্বন্দ্বরূপে সম্বন্ধ হইয়া থাকে। এই সকল বুদ্ধির যোগ হইতে সততঃই সমজ্ঞান করিয়া এবং ঐ সকল অসার অনিত্য পদার্থ জানিয়া মনকে শুদ্ধভক্তি, অর্থাৎ মান অপমানের বেগ তুচ্ছ করিয়া সমভাবে মনকে উভয় কুলের মধ্যে ধৈর্য্যাবলম্বন শক্তিদ্বারা স্থির করিয়া রাখিতে সর্ব্বতোভাবে চেষ্টা করিয়া প্রাক্তন দণ্ডগুলিকে পরিহারের জন্য ধৈর্য্য শক্তির আহরণ করিবে। ভগবান সকল শান্তির দ্বার খুলিয়া পরমানন্দ দিবেন। কাহারো কোন দোষ না লইবারই চেষ্টা করিয়া স্বকীয় ভাগ্যলব্ধ মনে করিয়া রাখিবে।


২৩৯ নম্বর বেদবাণীর এই পরম শিক্ষাটির সরল ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হলো:

*মূল ভাব ও ব্যাখ্যা*

এই বাণীর মাধ্যমে শ্রী শ্রী গুরুদেব মানুষের জীবনের নিত্যদিনের মানসিক দ্বন্দ্ব, সুখ-দুঃখ এবং তা থেকে মুক্তি পেয়ে পরম আনন্দ ও শান্তি লাভের উপায় অতি চমৎকারভাবে বর্ণনা করেছেন। বিষয়টিকে সহজভাবে বুঝতে নিচে কয়েকটি পয়েন্টে আলোচনা করা হলো:


*১. কালচক্র ও সংসারের দ্বন্দ্ব*

গুরুদেব বলছেন, এই সংসারে ভালো-মন্দ, সুখ-দুঃখ, শান্তি-অশান্তি, আপন-পর কিংবা শত্রু-মিত্র—এই সবকিছুই একটা দ্বন্দ্ব বা জোড়া হিসেবে আসে। আর এগুলো চিরকালই **'কালচক্রের'** (সময়ের চাকা) নিয়মে আবর্তিত হয়ে চলেছে। অর্থাৎ, আজ সুখ থাকলে কাল দুঃখ আসবেই, আজ কেউ মিত্র হলে কাল সে শত্রু হতে পারে। এটা সংসারের স্বাভাবিক নিয়ম।


*২. সমজ্ঞান ও বুদ্ধির যোগ*

সংসারের এই বিপরীত বিষয়গুলো (যেমন সুখ ও দুঃখ) দেখে আমাদের মন যেন চঞ্চল না হয়। বুদ্ধির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে এই সমস্ত জাগতিক জিনিসকে **অসার ও অনিত্য** (অস্থায়ী) বলে জানতে হবে। জীবনের কোনো প্রাপ্তিতে অতিরিক্ত আনন্দিত না হয়ে এবং কোনো ক্ষতিতে ভেঙে না পড়ে—সবকিছুকে সমানভাবে দেখার মানসিকতা বা **'সমজ্ঞান'** তৈরি করতে হবে।


*৩. মান-অপমান ও ধৈর্যের শক্তি*

আমাদের মনের অশান্তির একটা বড় কারণ হলো মান ও অপমান। গুরুদেব নির্দেশ দিচ্ছেন, মান-অপমানের যে মানসিক বেগ বা উত্তেজনা, তাকে তুচ্ছ করতে হবে। জীবনের ভালো ও মন্দ—এই **উভয় কুলের মধ্যে ধৈর্য ধারণ করে** মনকে স্থির রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। আমাদের পূর্বজন্মের বা অতীতের যে কর্মফল বা **'প্রাক্তন দণ্ড'** (কষ্ট বা শাস্তি) আমাদের ভোগ করতে হচ্ছে, তা থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র অস্ত্র হলো এই 'ধৈর্য শক্তি'।


*৪. পরমানন্দ লাভ ও নির্দোষ দৃষ্টি*

শান্তি পাওয়ার সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি হলো—**কারো কোনো দোষ না দেখা**। আমাদের জীবনে যা কিছু ঘটছে, বা কেউ যদি আমাদের সাথে খারাপ আচরণও করে, তবে অন্যের ওপর দোষারোপ না করে সেটাকে **'স্বকীয় ভাগ্যলব্ধ'** (নিজের ভাগ্য বা কর্মের ফল) বলে মেনে নিতে হবে। আমরা যখন অন্যের দোষ দেখা বন্ধ করে নিজের মনকে শান্ত ও ধৈর্যশীল করে তুলবো, তখন ভগবান নিজেই আমাদের জন্য সমস্ত শান্তির দ্বার খুলে দেবেন এবং আমাদের জীবন **'পরমানন্দে'** ভরে উঠবে।


*সংক্ষেপে:* সংসারের সব পরিস্থিতিকে সময়ের নিয়ম ও অস্থায়ী জেনে, মান-অপমান ভুলে ধৈর্য ধরুন। কারো দোষ না দিয়ে সবকিছু নিজের প্রারব্ধ বা ভাগ্য মনে করে মেনে নিলেই ঈশ্বরের কৃপায় পরম শান্তি লাভ করা সম্ভব।

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ