বেদবাণী : ৩/৪২ 📜 মূল বাণী ও তার পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা
কোন বিষয়ে পুরুষের [?] অধীর হইতে নাই।
- ব্যাখ্যা: এখানে 'পুরুষ' বলতে সাধারণ অর্থে মানবাত্মা বা যেকোনো মানুষকে বোঝানো হয়েছে। জীবনে পরিস্থিতি অনুকূল হোক বা প্রতিকূল, কোনো কিছুতেই অতিরিক্ত ব্যাকুল, চঞ্চল বা অধৈর্য হওয়া উচিত নয়। ধৈর্যই হলো আধ্যাত্মিক ও জাগতিক উন্নতির প্রথম চাবিকাঠি।
জগতে এক পরমাত্মার সঙ্গে সম্বন্ধ রাখিয়া সংসারের কার্য্য নির্ব্বাহ করিতে হয়।
- ব্যাখ্যা: আমরা কেউই এই পৃথিবীতে একা বা বিচ্ছিন্ন নই। আমাদের মূল উৎস সেই পরম ঈশ্বর বা পরমাত্মা। ঠাকুর বলছেন, সংসারে নিজের পরিবার, চাকরি বা ব্যবসার সমস্ত দায়িত্ব পালন করুন, কিন্তু মনের ভেতর আসল সংযোগটা যেন সর্বদা ঈশ্বরের সাথে থাকে। প্লাগ যেমন বোর্ডে গোঁজা থাকে, তেমনি মনের সংযোগটা পরমাত্মার সাথে যুক্ত রেখে বাইরের সব কাজ করে যেতে হবে।
জগতে যাহা কিছু দেখা যায় এবং ব্যবহার করা যায় মমতাহেতু কর্তৃত্ব অভিমান প্রাপ্ত হইয়া মোহিত হয়। ইহাতে পরমাত্মার শরণ থাকে না।
- ব্যাখ্যা: এই পৃথিবীতে আমরা যা কিছু বস্তু, সম্পত্তি বা মানুষ দেখি এবং ভোগ করি, অতিরিক্ত মায়া বা মমতার কারণে আমরা সেগুলোকে সম্পূর্ণভাবে "আমার" বলে ধরে নিই। আমাদের মনে অহংকার বা 'কর্তৃত্ব অভিমান' চলে আসে—যেমন, *"আমি এই সংসার চালাচ্ছি"*, *"এই বাড়ি-গাড়ি আমার"* বা *"আমার জন্যই সব হচ্ছে"*। এই অহংকার আর মোহের মায়াজালে জড়িয়ে আমরা জীবনের আসল সত্য অর্থাৎ পরমাত্মাকে ভুলে যাই এবং তাঁর শরণাগতি থেকে দূরে সরে আসি। আর এই অহংকারই মানুষের সমস্ত দুঃখের কারণ।
অতএব দিবানিশি এ সংসারে প্রারব্ধ-বশতঃ যাহা যাহা সঙ্গ হয় সকলের মধ্যেই আলগ্, যেমন আকাশ সকল বস্তুতেই মিশিয়া থাকে। তস্য হেতু আকাশের কোন অভাব হয় না,
- ব্যাখ্যা: এটি এই বাণীর সবচেয়ে মূল্যবান অংশ।** আমাদের পূর্বজন্মের কর্ম বা 'প্রারব্ধ' অনুযায়ী আমরা এই জীবনে নির্দিষ্ট কিছু মানুষ, পরিবার বা পরিস্থিতির সংস্পর্শে আসি। ঠাকুর উপদেশ দিচ্ছেন যে, দিন-রাত (দিবানিশি) এই সংসারে যার সাথেই আপনার যোগ হোক না কেন, মনের দিক থেকে আপনাকে **'আলগ্'** বা অনাসক্ত (detached) থাকতে হবে।
এখানে আকাশের চমৎকার উদাহরণ দেওয়া হয়েছে—আকাশ এই মহাবিশ্বের পাহাড়, পর্বত, ঘরবাড়ি, নদী—সব কিছুর সাথেই মিশে আছে। কিন্তু কোনো কিছুই আকাশকে স্পর্শ করতে বা বেঁধে রাখতে পারে না; আকাশ সবসময় মুক্ত। যেহেতু আকাশ কোনো কিছু আঁকড়ে ধরে না, তাই আকাশের কখনো কোনো কিছুর অভাব বা শূন্যতা তৈরি হয় না।
তেমনি আলগ্ হইয়া থাকিতে থাকিতে পরমাত্মার স্থান দর্শন শান্তির আকরে পড়িয়া যায় অভাব থাকে না।
- ব্যাখ্যা: আকাশের মতো আমাদেরও সংসারে সবার সাথে মিশে, সব কর্তব্য ভালোবেসে পালন করতে হবে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে মুক্ত বা 'আলগা' থাকতে হবে। এই অনাসক্তির অভ্যাস করতে করতে মানুষ একসময় নিজের ভেতরেই সেই পরমাত্মার দিব্য স্থানটি দর্শন করতে পারে। সেই অবস্থাটি হলো **'শান্তির আকর'** অর্থাৎ শান্তির খনি। সেখানে পৌঁছে গেলে মানুষের মনের সব বাসনা শান্ত হয়ে যায় এবং জীবনে কোনো কিছুর আর অভাব বা অপূর্ণতা থাকে না। মানুষ তখন পরম আনন্দ লাভ করে।
---
সংসার ছেড়ে বনে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। সংসারে সমস্ত দায়িত্ব পালন করুন, কিন্তু মনকে আকাশের মতো উদাসীন ও মুক্ত রাখুন। মায়া ও অহংকার ত্যাগ করে ঈশ্বরের ওপর ভরসা রাখলেই জীবনে প্রকৃত শান্তি ও অভাবহীনতা আসে।